মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

বরকল উপজেলার উপজাতীয়দের মধ্যে ভিন্ন ভাষাভাষী চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখুয়া এবং বাঙ্গালীদের মধ্যে মুসলমান, হিন্দু, ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় বসবাস করেন। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা ইন্দো-আর্যভাষার অর্ন্তগত দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বাংলাভাষার অনুরুপ এবং অন্যান্য উপজাতীর ভাষা তিব্বতী ব্রহ্মী ভাষাভুক্ত। অবশ্য তারা বাংলা ভাষা ও জানেন। সকল উপজাতির নিজস্ব সাহিত্য আছে। প্রায় প্রত্যেকটি উপজাতির লোকসাহিত্য নানা কারণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। কিন্তু একমাত্র চাকমা ছাড়া অন্যান্য লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাবে ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্য চর্চায় এ অঞ্চলের অধিবাসীরা পিছিয়ে নেই। বিশ শতকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এখানে বাংলা সাহিত্যে চর্চার যে ধারা সৃষ্টি হয়েছে তা মোটেও উপেক্ষিত নয়। পার্বত্যাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা জাতিই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় অগ্রণী। চাকমা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার গতি এখন বেগবান । সাহ্যি চর্চায় তাদের শ্রম ও নিষ্টা প্রশ্নাতীত। প্রায় এক শতাব্দি ধরে তারা বাংলায় গ্রন্থাদি প্রণয়ন করে আসছেন। শান্তিচুক্তি উত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে জাতীয় লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষকদের আগ্রহ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সময়ে প্রচুর গবেষণামূলক, রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষণ মূলক রচনা প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন উত্সবও পার্বণ উপলক্ষে সংকলন প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। এসব সংকলনের উপজীব্য পার্বত্য জীবনের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংঘাত ও টানাপোড়েন। তবে নিরেট সাহিত্য রচনা ও প্রকাশের পরিমাণ বর্তমানে অনুল্লেখযোগ্য। পার্বত্যাঞ্চলের সমৃদ্ধ সাহিত্য ধারাকে বিকশিত ও বেগবান করতে তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্য চর্চায় ব্রতী করা প্রয়োজন। সমাজের প্রাগ্রসর অংশের অভিনিবেশ এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অব্যাহত সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা এক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের অরণ্য গিরিঝর্ণাধারা পরিবেশ্টিত অরণ্য জনপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম। সুপ্রাচীনকাল থেকে ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংষ্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র রাঙ্গামাটি। এ রাঙ্গামাটিকে কেন্দ্রকরে পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্রময় সংষ্কৃতি বিকশিত হয়ে উঠেছে। ভিন্ন ভাষাভাষী ও জাতিসত্ত্বার নানা উপজাতি ও বাঙ্গালী অধ্যুষিত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিস্তৃর্ণ জনপদে রয়েছে নিজস্ব জীবন ধারা বাহিত সাংষ্কৃতিক চেতনা। সাম্প্রতিককালের তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গতিধারায় পাশ্চাত্য সংষ্কৃতির উষ্ণ ও আগ্রাসী প্রবাহ সর্ত্ত্বেও জুম ও অরণ্য কেন্দ্রীক পার্বত্য সংষ্কৃতিতে এখনো আগ্রাসী সময়ের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়নি। ‌ পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বা সমাজ পূর্ব পুরুষদের সার্থক উত্তরাধিকার হিসেবে নিজস্ব জীবন ধারায় তাদের আপন সংষ্কৃতি এখনো রক্ষা করে চলেছে গভীর মমতায়। সভ্যতার উন্নয়ন গতিধারার নগরায়নের ফলে উপজাতীয়দের পোষাকে বৈচিত্র ঘটেছে। ভাষা, আহর্য্য, পানীয়, সংষ্কার ও বিশ্বাসে তারা সমভাবে প্রাচীন সংষ্কৃতি ও আধুনিক ভাবনাধারা প্রভাবিত। এ ভাবনার বিস্তৃতি আহার্য্য ও পানীয়, পরিধেয় বস্ত্র ও অলংকার, বসবাসের বাড়ীঘর, ধর্মীয় মন্দির, সাংসারিক জীবনের ব্যবহার্য্য জিনিস পত্র, যুদ্ধ, শিকার ও মাছধরা ইত্যাদিতে ব্যবহৃত অস্ত্র শস্ত্র, যন্ত্র সংগীত- নৃত্যে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, খেলাধুলার সাজ সরঞ্জাম ইত্যাদিতে পরিব্যপ্ত। এখানকার শিল্প সাহিত্য, সংগীত ও নৃত্যকলা আদিম সংষ্কৃতির চেতনা বাহিত। পার্বত্য অঞ্চলের লোকজ সংষ্কৃতি বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে স্ব তন্ত্র। সাংষ্কৃতিক সাতন্ত্র চেতনায় এখানকার লোক জীবনকে বৈশিষ্ট মন্ডিত করেছে। আচার, প্রথা, সংষ্কার, ধর্ম, পূজা-পার্বণ, উত্সব, বিবাহরীতি, কৃষি, গৃহায়ণ, খাদ্যাভ্যাস, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা বলা চলে সামগ্রিক জীবন চেতনায় এখানে বিরাজমান যে স্বতন্ত্র ধারা তা বৃহত্তর বাঙ্গালী সংষ্কৃতি থেকে বহুলাংশে পৃথক এবং ঐতিহ্যমন্ডিত। এখানে জ্ঞাতি সম্পর্ক, সালিশ- বিচার, যাদু মন্ত্র, বশীকরণ, চিকিত্সা, বিবাহ, সাহিত্য, নৃত্য-গীত, মৃত্যুর পরের বিশ্বাস, অনুষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে পার্বত্য অঞ্চলের সংষ্কৃতি পৃথক ও বিশেষ বৈশিষ্ঠ্য মন্ডিত।